দেশব্যাপী ডেঙ্গুর ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা
দেশব্যাপী ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে বাড়তে থাকা রোগীর চাপের মধ্যে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষ্য, বিদ্যমান শয্যার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। এর মধ্যে হাম ও ডেঙ্গু—দুই রোগের রোগী বাড়তে থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও বেড়েছে।
রাজধানীর বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই শয্যাসংকট রয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের অসংক্রামক রোগ, দুর্ঘটনা এবং জরুরি অস্ত্রোপচারের রোগীদের পাশাপাশি সংক্রামক রোগের রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মকর্তারা জানান, ২ হাজার ৬০০ শয্যার এ হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাম ও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হলেও বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে চিকিৎসক ও নার্সদের অনেক সময় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পৃথক কর্নার রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৭২৯ জন এবং মারা গেছেন পাঁচজন। একই সময়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩৯ জন। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৪৫৮ জন এবং মারা গেছেন ১৯ জন।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, গত এক সপ্তাহে ডেঙ্গুতে আরও কয়েকজনের মৃত্যু হলেও তাদের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার রাজধানীর তুলনায় ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি। বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এডিস মশার বিস্তার বাড়ছে। ফলে গ্রামাঞ্চলেও ডেঙ্গু দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গত বছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তার ঘটে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয় বরগুনা। সে সময় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি সুপারিশ করলেও সেগুলোর বেশির ভাগ বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম)–এর কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. গোলাম ছারোয়ার বলেন, সারা দেশে এডিস মশার ঘনত্ব নিরূপণে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, এ বছর গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ব্যাপক হতে পারে এবং এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রাক্-বর্ষা কীটতাত্ত্বিক জরিপেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, রাজশাহী নগরীতে এডিস মশার প্রজনন সূচক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত উচ্চঝুঁকির সীমার অনেক ওপরে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বর্ষা মৌসুমে সেখানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, রাজধানীর তুলনায় ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এখনই মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মোস্তাক হোসেনও একই মত প্রকাশ করে বলেন, গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবু হোসেন মোহাম্মদ মইনুল আহাসান বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা হয়েছে। এডিস মশা দমনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।