দাম চড়া ইফতার সামগ্রীর
পবিত্র রমজান মাসে সারা দিন রোজা রাখার পর অনেকেই লেবুর শরবতে চুমুক দিয়ে গলা ভেজাতে চান। বাজারে তাই লেবুর চাহিদা বেড়েছে। এই সুযোগে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন বিক্রেতারা।লেবু বিক্রি হচ্ছে হালিপ্রতি ৫০-৮০ টাকা দরে। কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে এমন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।
লেবুর মতো দাম বেড়েছে শসা, লম্বা বেগুন এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের ফলের। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ইফতারসামগ্রীর দাম চড়া, যা সাধারণ মানুষের খরচ বাড়িয়েছে। চাহিদা বাড়ার সুযোগে পণ্যগুলোর দর কিছুটা বেড়েছে।নিত্যপণ্যের মধ্যে চিনি, ছোলা, পেঁয়াজ, আলু, আটা ইত্যাদির দাম স্থিতিশীল আছে। বিশেষ করে মৌসুমের কারণে পেঁয়াজ ও আলুর দাম অনেকটাই কম। চিনির সরবরাহ ভালো, দাম বাড়েনি। বরং গত বছরের তুলনায় দাম এবার কম। তবে সংকট চলছে বোতলজাত সয়াবিন তেলের। এই সুযোগে খোলা তেলের দাম নির্ধারিত দরের চেয়ে লিটারে ২৮-৩৩ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
চাল ও ডালের দাম আগে থেকেই চড়া। মাছ-মাংসের বাজারেও স্বস্তি নেই।
ইফতারের পণ্যের দাম বৃদ্ধি:
রমজানমাসে ইফতারের সময়ে বিভিন্ন প্রকার খাদ্যসামগ্রীর চাহিদা বেড়ে যায়, তবেএবারের রোজায় কিছু পণ্যের দাম অতিরিক্ত বাড়ায় বাজারে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষদের জন্য। বেগুনি, পেঁয়াজু, শসা, মাংস সহ বেশ কিছু পণ্যের দাম উল্লেখ যোগ্য ভাবে বেড়েছে, যা ক্রেতাদের পকেটে চাপ সৃষ্টি করছে।
ইফতারিও খাবারের অন্যতম প্রধান উপকরণ বেগুন এবং শসার দামবেড়েছে। বিশেষ করে বেগুনের দামপ্রতিবছরই রোজায় বাড়ে, আর এবারের রোজায়ওতার ব্যতিক্রম হয়নি। ঢাকার মোহাম্মদপুর, টাউন হল মার্কেট, আগারগাঁওয়ের তালতলা বাজার এবং কারওয়ান বাজারেখুচরা বাজারে লম্বা বেগুনের দাম কেজিতে ১০-১৫ টাকা বেড়ে৬০-৭০ টাকার মধ্যেবিক্রি হচ্ছে। তবে, ব্যবসায়ীরা আশাবাদীযে কয়েক দিনের মধ্যেবেগুনের দাম কমে যাবে, কারণ সাধারণত রোজার প্রথম দিকে দাম বেশিথাকে, পরে তা স্বাভাবিকহয়ে আসে।
অন্যদিকে, শসার দামও বেড়েছে। দেশিশসা এখন ৮০-১০০টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরেরতুলনায় বেশ কিছুটা বেশি।তবে, হাইব্রিড শসা কিছুটা কমদামেও পাওয়া যাচ্ছে, ৫০-৬০ টাকায়।
মাংস ও মাছের দাম বৃদ্ধি
এবারেররোজায় ব্রয়লার মুরগি ও গরুর মাংসেরদামও বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ২০ টাকা বৃদ্ধিপেয়ে ২১০-২২০ টাকায়বিক্রি হচ্ছে। আর দেশি গরুরমাংস কেজিতে ৩০ টাকার মতোবেড়ে ৭৮০ টাকার আশপাশেবিক্রি হচ্ছে। এর সাথে সাথেইমাছের দামও বেড়েছে। বিশেষতখাল, বিল, নদী-নালারমাছ যেমন বেলে, পোয়া, বোয়াল, আইড়, শোল ইত্যাদিরদাম কেজিতে ৫০০ টাকার নিচেপাওয়া কঠিন। তাজা ও বড়আকারের মাছের দাম ৭০০-৮০০টাকায় উঠেছে।
একইভাবে, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বেড়েছে। ভোজ্যতেলেরদাম ১১-২০ শতাংশবৃদ্ধি পেয়েছে, তবে চিনি ওখেজুরের দাম কমেছে। গতরমজানের তুলনায় এবার সব ধরনেরচালের দাম ৬-১০শতাংশ বেড়েছে, যদিও আটা, ময়দা, আলু, টমেটো, আদা ও পেঁয়াজেরদাম কিছুটা কমেছে।
ইফতারিতেব্যবহৃত অন্যতম উপাদান মুড়ির দাম এবারে অপরিবর্তিতরয়েছে। সাধারণ মানের মুড়ি ৮০ টাকারকেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, এবং হাতে ভাজা মুড়িরদাম ১২০-১৩০ টাকাপ্রতি কেজি।
সরকারবিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতেকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ভোজ্যতেল, চিনি, খেজুরের মতো পণ্যে শুল্কছাড় দেওয়ায় চিনি এবং খেজুরেরদাম কিছুটা কমেছে, তবে সয়াবিন তেলেরদাম আগের মতোই উঁচুরয়ে গেছে।
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রেস উইং থেকে জানানোহয়েছে যে, গত বছরেররমজানের তুলনায় এবারের অধিকাংশ পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়েএসেছে। প্রেস সচিব শফিকুল আলমজানান, পুরো রমজান মাসজুড়ে সরকারের নজর থাকবে দামনিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য, এবং আশা করাযায় যে সাপ্লাই পরিস্থিতিআরো উন্নতি হবে।
ফলের দাম চড়া: বিদেশি ফলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশী ফলের দাম ও বেড়েছে
রমজানমাসে ইফতার ও সেহরিতে ভোজনেরঅন্যতম উপাদান হিসেবে ফলের চাহিদা বেড়েযায়। কিন্তু এই বছর ফলেরদাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বিশেষকরে বিদেশি ফলগুলোর দাম আগের তুলনায়অনেক বেড়েছে, এবং তার সাথেদেশি ফলের দামও উঁচুহয়েছে। এই দামের ঊর্ধ্বগতিরকারণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য হলো বিদেশি ফলেরউপর বাড়তি শুল্ক-কর আর উচ্চডলারের মূল্য।
গতমাসে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিদেশি ফলের ওপর সম্পূরকশুল্ক ২০ শতাংশ থেকেবাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করারসিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে, ফল আমদানির খরচ বেড়ে গেছেএবং সেই অনুযায়ী বাজারেফলের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে।একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন ১০০ টাকারফল আমদানি করলে ১৩৬ টাকাশুল্ক-কর দিতে হয়, যা ফলের দাম বাড়ানোরঅন্যতম প্রধান কারণ। ফলে, ভোক্তারা বিদেশিফল কিনতে বেশি দাম দিতেহচ্ছে।
বাজারেখুচরা বিক্রেতাদের সাথে কথা বলেজানা গেছে, গত তিন-চারদিনের মধ্যে বিদেশি ফলগুলোর দাম কেজিতে ২০-৫০ টাকা পর্যন্তবেড়েছে। যেমন, মাল্টার দাম গতকাল কেজিতে৩০০-৩২০ টাকার মধ্যেবিক্রি হচ্ছিল, যা তিন দিনআগে ২৭০-৩০০ টাকারমধ্যে পাওয়া যেত। অন্যদিকে, আপেল, কমলা, আঙুর, আনারসের দামও ২০-৬০টাকার মধ্যে বেড়েছে। বিদেশি ফলের চাহিদা বেশিহওয়ায় এসব ফলের দামবেড়েছে।
বিদেশিফলের দাম বেড়ে যাওয়ারকারণে দেশি ফলের দামওকিছুটা বেড়েছে। যেমন, পেয়ারা বর্তমানে ১০০-১৩০ টাকারমধ্যে বিক্রি হচ্ছে, যা সপ্তাহখানেক আগে৭০-১০০ টাকার মধ্যেপাওয়া যেত। এছাড়া কলা, বরই, পাকা পেঁপে, আনারসেরদামও কিছুটা বেড়েছে। ফল বিক্রেতারা জানান, রোজায় ফলের চাহিদা বেড়েছে, যার কারণে দাম আরও কিছুটাবাড়ছে।
ফল আমদানিকারকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, উচ্চশুল্ক-কর ও ডলারেরদাম বেড়ে যাওয়ায় বিদেশিফল আমদানির খরচ অনেক বেড়েগেছে। ফলে, এই খরচেরচাপ ভোক্তাদের উপর পড়ছে এবংতারা চড়া দামে ফলকিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
কারওয়ানবাজারের ফল বিক্রেতা আরশাদুলইসলাম বলেন, "রমজানে ফলের চাহিদা বাড়ারকারণে দাম কিছুটা বেড়েছে, তবে কয়েক দিনের মধ্যেদাম কমতে পারে। কিন্তুসারা বছর যে দামথাকে, তা–ও অনেকবেশি, কারণ পাইকারি বাজারেকিনতে হলে বেশি দামদিতে হয়।"
এছাড়া, কিছু ব্যবসায়ী আশাবাদীযে, কয়েক দিনের মধ্যেবিদেশি ফলের দাম কিছুটাকমবে, তবে বর্তমান শুল্ক-কর পরিস্থিতির কারণেদাম স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা কম।