ছায়ানটে শেষবারের মতো সন্‌জীদা খাতুনকে ফুলেল শ্রদ্ধা

দুই বছর আগে হুইলচেয়ারে বসে ছায়ানটে এসেছিলেন সনজীদা খাতুন, যখন তার নব্বইতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে 'নবতিপূর্ণা' শিরোনামে এক বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল। আর আজ, তিনি চলে গেলেন চিরতরে, নিথর দেহে। সনজীদা খাতুন ছিলেন বাঙালি সংস্কৃতির এক মহান পথপ্রদর্শক, যার অবদান কখনও ভুলে যাওয়ার নয়।

ছায়ানটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং সর্বশেষ সভাপতি হিসেবে তার অবদান ছিল অপরিসীম। আজ বুধবার সকালে ছায়ানট ভবনে ভিড় করেন শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ, যারা দীর্ঘ লাইন ধরে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। তার মরদেহের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং লালনের গানের সুরে তাকে স্মরণ করেন। তাঁর জীবনযাত্রার অন্যতম সঙ্গী শুদ্ধসংগীত ছিল, এবং সেই সুরে ছায়ানটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তাকে বিদায় জানান।

অগ্রগণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা সনজীদা খাতুনকে শুদ্ধসংগীতের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একজন কিংবদন্তি হিসেবে স্মরণ করেছেন। সংগীতশিল্পী খুরশীদ আলম বলেন, তিনি বাংলা সংগীত অঙ্গনের নক্ষত্র ছিলেন, সারাজীবন ছায়ানটের জন্য নিবেদিত ছিলেন। নাট্যজন ম. হামিদ বলেন, তিনি আমাদের শিখিয়েছেন দেশকে ভালোবাসতে, সংস্কৃতিকে ভালোবাসতে। তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

১৯৩৩ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী সনজীদা খাতুন জীবনের শুরু থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন এবং বায়ান্নরের ভাষা আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। তার অবদান শুধু সংগীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তিনি বাংলা সংস্কৃতির প্রতিটি শাখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার লেখা ১৬টি বইয়ের মধ্যে ‘সাংস্কৃতিক মুক্তিসংগ্রাম’ বইটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ এবং বাঙালি সংস্কৃতির সংগ্রামের ইতিহাস ধারণ করেছে।

একুশে পদক, বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, এবং রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) লাভের মাধ্যমে তার সংস্কৃতিচর্চায় অমূল্য অবদান স্বীকৃত হয়েছে। তাঁর জীবনে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা ছিল এবং তার মতো একজন গুণী শিল্পীর চলে যাওয়া বাংলা সংস্কৃতির জন্য এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে।

তাঁর মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হয়, যেখানে সর্বস্তরের মানুষ তাকে শেষ বিদায় জানান। সনজীদা খাতুনের কর্মগুণ এবং তার দৃষ্টিভঙ্গি সবার মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকবে, এবং তার দ্বারা প্রদর্শিত পথের আলো আমাদের সাংস্কৃতিক পরম্পরাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

All Categories