বুড়িগঙ্গা পরিষ্কারে কোন নিনজা টেকনিকের কথা বললেন উপদেষ্টা রিজওয়ানা?
বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত করতে চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তা কামনা করে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, “বুড়িগঙ্গা পরিষ্কার করতে হলে নিনজা টেকনিক লাগবে, এ ছাড়া হবে না।”
শনিবার ঢাকায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত ‘Sustainable Governance of China’s Energy Investment in Bangladesh’ শীর্ষক কর্মশালায় তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথ।
‘নিনজা টেকনিক’—যা মূলত মধ্যযুগীয় জাপানে গুপ্তচর বা ভাড়াটে যোদ্ধাদের গোপন কৌশল বোঝাতে ব্যবহৃত হতো—এখন দক্ষ ও সূক্ষ্ম কৌশল প্রয়োগের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে বুড়িগঙ্গার ক্ষেত্রে এই “নিনজা টেকনিক” কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি উপদেষ্টা।
বুড়িগঙ্গার দূষণ: দীর্ঘ প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল
পরিবেশ আন্দোলনের পুরোনো মুখ রিজওয়ানা হাসান অতীতে বুড়িগঙ্গা দূষণ নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। ২০২০ সালের এক নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণেই নদীর এ করুণ দশা। শনিবারের কর্মশালায়ও সেই হতাশা ফুটে ওঠে তাঁর কণ্ঠে। তিনি বলেন, “বছরের পর বছর ধরে নদী দূষণ চলছে, এখনো থামেনি।”
“বড় অবকাঠামো নয়, পরিষ্কার বাতাস ও সবুজ নদীই প্রকৃত উন্নয়ন”
রিজওয়ানা হাসান বলেন,
“প্রতি নির্বাচনে প্রার্থীরা বলেন কত রাস্তা বা সেতু করবেন, কিন্তু কেউ বলেন না কত পার্ক গড়বেন বা কৃষিজমি বাঁচাবেন কীভাবে। সবাই মনে করে বড় অবকাঠামোই উন্নয়ন। কিন্তু পরিষ্কার বাতাস, নদী, কৃষিজমিও উন্নয়নের অংশ।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখন সময় এসেছে উন্নয়ন ভাবনায় পরিবর্তন আনার—যেখানে কৃষিজমি, নির্মল বাতাস, সবুজ নদী এবং জনগণের অংশগ্রহণ থাকবে কেন্দ্রবিন্দুতে।
পদ্মা সেতু ও জাজিরা ভাঙনের উদাহরণ
নিজেকে পদ্মা সেতুর একজন সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পদ্মা সেতু হয়েছে, কিন্তু জাজিরা এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। নদী তার নিজস্ব নিয়মে চলে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সেটি কেউ ভাবেনি। এখন নদীভাঙন ঠেকাতে আরও বড় বিনিয়োগ লাগবে, না হলে গ্রামের পর গ্রাম ভেসে যাবে।”
চীনের সহায়তায় পরিবেশ পুনরুদ্ধারের আহ্বান
চীনের কাছ থেকে কেবল আর্থিক নয়, প্রযুক্তিগত সহায়তাও প্রত্যাশা করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “চীন একসময় দূষণের জন্য পরিচিত ছিল, কিন্তু পরে তারা বিশাল বিনিয়োগ করেছে পরিবেশ পুনরুদ্ধারে। আজ বেইজিং পরিচ্ছন্ন বায়ুর শহর, তাদের মডেল এখন অনুসরণযোগ্য।”
তিনি পরামর্শ দেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘আগে পরিবেশ, পরে উন্নয়ন’—এই ধারণা অনুসরণ করা উচিত।
নবায়নযোগ্য শক্তিতে চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে
বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। রিজওয়ানা হাসান মনে করেন, চীনের সৌর ও বায়ুশক্তিতে অগ্রগতির অভিজ্ঞতা এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জবাবদিহিমূলক বিনিয়োগের আহ্বান
তিনি আরও বলেন, “কোনো স্বৈর সরকারের আয়ু বাড়াতে মেকআপ প্রকল্পে বিনিয়োগ করা উচিত নয়। জনগণের অর্থে বিনিয়োগ মানেই জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা।”
কর্মশালার অন্যান্য বক্তব্য
কর্মশালায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট, কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা ২৭ হাজার মেগাওয়াট—অর্থাৎ ৪০ শতাংশ অতিরিক্ত। তাঁর মতে, এখন সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো উপাচার্য সায়েমা হক বিদিশা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে গবেষণায় এগিয়ে যেতে চায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল ইফতেখার আনিস কর্মশালার সূচনা বক্তব্য রাখেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ বদরুল হাসান স্বাগত বক্তব্য দেন।
ইউনিভার্সিটি অব বাথ-এর সহযোগী অধ্যাপক জিয়ান সান বিশ্বে জ্বালানি রূপান্তর খাতে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
দিনব্যাপী এই কর্মশালায় জ্বালানি ও বিনিয়োগ খাতের বিশেষজ্ঞরা চারটি অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নেন।