বিনিয়োগকারীদের হতাশা, নীতিনির্ধারকদের নিরবতা

বাংলাদেশের শেয়ারবাজার যেন এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। বারবার আস্থার সংকটে পড়ে বিনিয়োগকারীরা নিঃস্ব হচ্ছেন, কিন্তু অবস্থার উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই বাজার পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়বে।

নানান সময়ে রাজধানীজুড়ে ক্ষুব্ধ বিনিয়োগকারীদের মুখে উঠে এসেছে প্রতিবাদের স্লোগান "শেয়ারবাজার ঠিক করো, নইলে বুকে গুলি করো"। যদিও এসব স্লোগান শুনে শিউরে ওঠার কথা বাজার-নীতিনির্ধারকদের, বাস্তবে তারা যেন নির্লিপ্ত দর্শক। শেয়ারবাজারে বারবার পতনে বিনিয়োগকারীরা শুধু অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, অনেকে হারাচ্ছেন জীবনের লক্ষ্য, সাহস, এমনকি বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাও।

গত বছরের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীরা নতুন করে আশাবাদী হয়েছিলেন। ভাবছিলেন, নতুন নেতৃত্বে শেয়ারবাজারে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু আট মাস পেরিয়ে গেলেও সেই আশায় জল ঢেলেছে লাগাতার সূচক পতন, লেনদেন সংকোচন এবং নিরবচ্ছিন্ন দরপতনের ধারা।

শুধু গত সপ্তাহেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স কমেছে ১০৮ পয়েন্ট বা প্রায় ২ শতাংশ। বাজার মূলধন কমেছে ১ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। দৈনিক গড় লেনদেন কমে দাঁড়িয়েছে ৪০০ কোটির নিচে। লেনদেন হওয়া ৩৯৬ কোম্পানির মধ্যে ২৯৯টির শেয়ারের দাম কমেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও দুই স্টক এক্সচেঞ্জের নেতৃত্বে সংকট নিরসনে কার্যকর পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের ভাষায়, “বাজার রক্ষায় যাঁদের উদ্যোগ নেওয়ার কথা, তাঁরা ব্যস্ত থেকেছেন সরকারের তোষণ আর নিজের অবস্থান রক্ষায়।

ডিএসইর পরিচালক শাকিল রিজভী সম্প্রতি স্বীকার করেছেন, “পুঁজিবাজারে এখন আস্থার অভাব কাজ করছে। বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত, বাজারে নেই কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা।” অথচ ২০১৯ সালেও তিনি বলেছিলেন, “বাজার এমনিতেই ঘুরে দাঁড়াবে।” পাঁচ বছর পর দেখা যাচ্ছে, বাজারের সেই স্বতঃস্ফূর্ত ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বাস্তবের মাটিতে দাঁড়ায়নি।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডিএসই পরিচালনা পর্ষদ এখন নিজেরাই আস্থার সংকটে ভুগছেন, অথচ তাঁদেরই দায়িত্ব ছিল বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা। প্রশ্ন উঠেছে যারা দিনের পর দিন বাজারের পতন দেখছেন, সংকটের গভীরে গিয়ে নিঃশব্দ থেকেছেন, তাঁরা এখনো কীভাবে পদ আঁকড়ে ধরে আছেন?

ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন ২০১৩ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন ১৯৯৩ অনুযায়ী, শেয়ারবাজার পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব বাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করা। ভালো কোম্পানির শেয়ারে পতন আর দুর্বল কোম্পানির অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধিতে যদি পর্ষদ নির্বিকার থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে তাঁদের ভূমিকা আসলে কী?

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাবেক সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান বলেন, ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হলে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে না। পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। করহার যৌক্তিকভাবে সমন্বয় না করা হলে বাজারে উন্নয়ন হবে না।

ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান বলেন, আমরা কখনোই এতটা হতাশ ছিলাম না। বর্তমান কমিশন বাজারের সংকট চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। কার্যকর সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বাজারে এখন চরম অনিশ্চয়তা।

বিশ্লেষকদের মতে, সময় এখনই। অবহেলা, দায়সারা মনোভাব ও নেতৃত্বের ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তবমুখী ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শেয়ারবাজার কেবল অর্থনীতির আয়না নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। সেই বাজারকে বাঁচাতে হলে এখনই নিতে হবে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ। তা না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আর কখনোই ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না এমন আশঙ্কাই এখন প্রকট।

All Categories