বায়ুদূষণে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে ২৪২জন, বছরে ক্ষতি ২৩ বিলিয়ন ডলার
দেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকির নাম এখন বায়ুদূষণ। বাতাসে ভাসমান অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা পিএম২.৫–এর কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সার ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জন মানুষ অকালেই প্রাণ হারাচ্ছেন। একই সঙ্গে কমছে কর্মক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা এবং বছরে দেশের অর্থনীতিতে ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।
এ তথ্য উঠে এসেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের ক্লাইমেট চেইঞ্জ, এয়ার কোয়ালিটি অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ ইউনিটের এক গবেষণায়। সম্প্রতি গবেষণাটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পলিউশন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগের চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত হোসেনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই গবেষণায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল—এই ছয়টি প্রধান শহরে পিএম২.৫–জনিত বায়ুদূষণের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, শুধু এই ছয় শহরেই বছরে প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে পিএম২.৫ দূষণের কারণে। অর্থাৎ প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২৬০ জন এবং প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জনের মৃত্যু হচ্ছে এই দূষণের প্রভাবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছেন হৃদরোগে। বছরে এ সংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার ৫১৯। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে মারা যাচ্ছেন ৮ হাজার ৩৪৪ জন এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে প্রাণ হারাচ্ছেন আরও ৮১১ জন।
শহরভিত্তিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। গবেষণা অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই বছরে প্রায় ৬৮ হাজার ৭০৩ মানুষের অকালমৃত্যু পিএম২.৫ দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঢাকার পর রয়েছে চট্টগ্রাম, যেখানে বছরে প্রায় ১১ হাজার ২০২ জনের মৃত্যু হচ্ছে। এছাড়া রাজশাহীতে ২ হাজার ৮২৭, খুলনায় ২ হাজার ৬২৫, সিলেটে ১ হাজার ৪৮৮ এবং বরিশালে ১ হাজার ৩৯৫ জনের অকালমৃত্যুর পেছনে দায়ী বায়ুদূষণ।
২০১৩ থেকে ২০২১ সালের তথ্য বিশ্লেষণে গবেষকেরা দেখেছেন, ছয়টি শহরেই বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র ঢাকায়, যেখানে প্রতি বছর গড়ে আরও প্রায় ৩ হাজার ৪৮৪ জন অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে পিএম২.৫ দূষণের কারণে।
স্বাস্থ্যগত ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনীতিতেও এর প্রভাব ব্যাপক। গবেষণায় হিসাব করা হয়েছে, পিএম২.৫ দূষণের কারণে বছরে প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতির পরিমাণ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
গবেষক দলের প্রধান মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বায়ুদূষণকে সাধারণত পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকট।
তার ভাষায়, “আমাদের গবেষণা দেখাচ্ছে, বছরে প্রায় ৮৮ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু এবং জিডিপির প্রায় পাঁচ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই ক্ষতি আরও বাড়বে।”
গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বায়ুর গুণগত মান–সংক্রান্ত নির্দেশিকা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এ জন্য গবেষকেরা পিএম২.৫ নির্গমন কমাতে প্রমাণভিত্তিক নীতি গ্রহণ, শিল্পকারখানা ও যানবাহনের দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নগরাঞ্চলে সমন্বিত বায়ুমান ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।