আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য ১৪ দলের শরিকদের দুঃখ প্রকাশ, রাজনীতিতে ফেরার ইচ্ছা
আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত দুর্নীতি, লুটপাট এবং জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া গণহত্যার দায় নিতে নারাজ ১৪ দলের শরিক দলগুলো। তারা দীর্ঘ দুই দশকের রাজনৈতিক মিত্রতার পর, এখন ‘দুঃখ প্রকাশ’ করে স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরতে চায়। ১৪ দলের শরিকদের দাবি, যদিও তারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিল, তবে আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাদের সরাসরি কোনো ভূমিকা ছিল না। এই অবস্থায়, তাদের অনেকেই মনে করেন যে অতীতের সম্পর্কের কারণে তারা এখনও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান, এবং সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, এমপি ও নেতা গ্রেপ্তার হন। আরও অনেক নেতা বিদেশে পালিয়ে যান। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তছনছ হয়ে যান এবং অধিকাংশ নেতা এখন আত্মগোপনে রয়েছেন।
এদিকে, ১৪ দলের শরিক দলগুলোরও একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের মিত্র হিসেবে একসময় যারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল, তারা এখন রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে, ১৪ দলের দুই শরিক দল—ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু—একাধিক হত্যা মামলার আসামি হয়ে কারাগারে আছেন। ফলে, গণঅভ্যুত্থানের পর, ১৪ দলকেও নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে, যা তাদের সামনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তবে, ১৪ দলের কয়েকজন নেতা জানান, পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেও কিছু শরিক দলের কার্যক্রম এখনও চলছে। ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদ ঘরোয়া বৈঠক, আলোচনা সভা এবং বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানিয়ে চলেছে। গণতন্ত্রী পার্টির আরশ আলী নেতৃত্বাধীন অংশ জাতীয় দিবসে দলীয় ব্যানার ও নেতাকর্মীসহ অংশ নিয়েছে। তরীকত ফেডারেশন সময়-সময় বিবৃতি দিয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে, এবং বাসদ (রেজাউর) শিগগিরই জেলা ও উপজেলা সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অন্যদিকে, জাতীয় পার্টি (জেপি), ন্যাপ, সাম্যবাদী দল, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি এবং গণতন্ত্রী পার্টি (শাহাদাৎ) এখনও প্রকাশ্যে কোনো কার্যক্রম শুরু করেনি। তবে, তারা একে অপরের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ রেখে রাজনীতিতে ফেরার কৌশল নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে।
১৪ দলের বেশ কয়েকজন নেতা জানান, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কের জন্য তারা দেশের জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে চান। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের কোনো অস্তিত্ব এখন আর নেই এবং এর প্রাসঙ্গিকতা এখন শেষ হয়ে গেছে। তারা নিজেদের আদর্শে ফিরে স্বাভাবিক রাজনীতি শুরু করতে চান এবং এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের মিত্র জোটে থাকার বিষয়টি তাদের জন্য একটি কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গণতন্ত্রী পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন, "মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪ দলের অংশ হয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ দুর্নীতি, গণতন্ত্র হরণ, নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস এবং অপকর্মের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে পড়েছে। আমরা এসবের দায়ভার নিতে রাজি নই।"
বাসদ (রেজাউর) এর আহ্বায়ক রেজাউর রশীদ খান বলেন, "গত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ যেসব অপকর্ম করেছে, তার দায় তাদেরই। কিন্তু ১৪ দল শরিক হওয়ার কারণে, দেশের জনগণের কাছে আমাদের দল দুঃখ প্রকাশ করছে এবং আমরা স্বাভাবিক রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চাই।"
এভাবে ১৪ দলের শরিক দলগুলো এখন নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করছে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে, তাদের সামনে নানা বাধা এবং অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, বিশেষ করে গত ১৬ বছরের অভিজ্ঞতার পর রাজনৈতিক মাঠে তাদের অবস্থান কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।