আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে টেক্কা দেবে নাহিদদের দল?

২৮  ফেব্রুয়ারি  বিকেলে নাহিদ-সারজিসরা যখন  নতুন/ব্র‌্যান্ড নিউ রাজনৈতিক দলের  আত্মপ্রকাশ ঘটাচ্ছিলেন, তারেক রহমান তখন অনলাইনে বিএনপির জনসভায় বক্তব্য রাখায় ব্যস্ত ছিলেন। বিশ্লেষকরা এ বিষয়টা নিয়ে একটু মজা করতে ছাড়েননি। বলেছেন- তারেক রহমান আসলে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এনপিসিকে তেমন গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই।  বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদের উক্তি যেন আরেক কাঠি সরেস – তারমতে  সেকেন্ড রিপাবলিক কিংবা গণপরিষদ আসলে জাতীয় নির্বাচন পেছানোর এক তালবাহানার  নাম !


সে যাই হোক,  বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করতে আত্মপ্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি। দলটি প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা থেকে সরে এসে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছে। ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ও ‘গণপরিষদ’ গঠনের কথা বলে দলটি একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে সবচেয়ে আলোড়ন তুলেছে তাদের-  ইনকিলাব জিন্দাবাদ শ্লোগান ! যদিও শ্লোগানটি তাদের অফিসিয়াল শ্লোগান নয়। তবে,

১৯২৯ সালে ভগৎ সিং আর বটুকেশ্বর দত্ত যখন দিল্লির বিধানসভায় বোমা ফাটিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলে গগনবিদারি আওয়াজ তুললেন-  তার প্রায় ১০০ বছর পর সেটার প্রতিধ্বনি যেন শোনা গেল বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনের দেয়ালে ! যে সংসদ গত  সাত মাস আগে লাখো ভগৎ সিংকে দেখেছিলো  !ব্রিটিশ শাসকের বুকে কাঁপন ধরানো এ শব্দযুগল যেন এখনো কাঁপন ধরিয়ে যাচ্ছে সমান তালে। অর্থ্যাৎ- স্লোগানের বার্তা পরিস্কার !


এরপরই আলোচনায় ‘সেকেন্ড রিপাবলিক!  এনসিপির রাজনৈতিক দর্শন বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তারা বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চায়। "সেকেন্ড রিপাবলিক" ধারণাটি মূলত বিদ্যমান সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠনের দাবি করে। তারা গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়নের কথা বলছে, যা বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে এক নতুন ধারণা। তবে ধারণাটি ফরাসি বিপ্লবকে মনে করিয়ে 
ফ্রান্সে, ফরাসি দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র (১৮৪৮-১৮৫২) - প্রথম প্রজাতন্ত্র (১৭৯২-১৮০৪) এবং জুলাই রাজতন্ত্র (১৮৩০-১৮৪৮) পতনের পর প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৪৮ সালের ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে এটি গঠিত হয় এবং এর প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন লুই-ন্যাপোলিয়ন বোনাপার্ত, যিনি পরে অভ্যুত্থান করে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেন ।


আচ্ছা, দল তো গঠন হলো, টিকবে তো?
 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন দলগুলোর আত্মপ্রকাশ নতুন কিছু নয়, তবে টিকে থাকার লড়াইয়ে অধিকাংশ দলই ব্যর্থ হয়েছে। এনসিপি যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রাখতে চায়, তবে তাদের সুস্পষ্ট কর্মসূচি, বাস্তবায়নযোগ্য নীতি এবং শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো দরকার। এবং নতুন এ দলটির সেটা আছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 
অনেকে বলছেন, দলটি মধ্যপন্থী মধ্যবিত্তের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং তারা প্রচলিত রাজনীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে তাদের কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নীতি এবং বাস্তবায়ন কৌশল এখনও অস্পষ্ট। এনসিপি আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করলেও, তারা নতুন কী ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আনতে চায়, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। তবে নতুন দল হিসেবে এনসিপিকে কিছুটা সময় দেয়াই যায় বলে মত অনেকেরই। 

এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সমর্থকরা মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার করে একটি নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। দলটির মতে, বর্তমান সংবিধান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এটি জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করে না। এই জায়গাটিতেই কাজ করবে এনসিপি। সারজিস আলমরা ইতিমধ্যেই নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। 


তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা একটি জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যা শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এছাড়া, বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়, যা দলটি কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়নি। দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ঐক্য এবং বাস্তবায়ন কৌশল ছাড়া দলটি কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। নতুন সংবিধান প্রণয়নের আহ্বান জনসাধারণের মধ্যে কেমন সাড়া ফেলে, সেটাও দেখার বিষয়। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- দলটি কি আদৌ-  বিএনপি বা জামায়াত কিংবা আওয়ামী লীগকে -টেক্কা দিতে পারবে?


 

All Categories