যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিতে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের লাভজনক অবস্থান?

বাংলাদেশ ৯০ দিনের আলোচনার সময় পেলেও কার্যকর কোনও অগ্রগতি করতে পারেনি বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবির। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ‘উইন-উইন’ কৌশলে আগালেও, এই সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। আগস্ট পর্যন্ত সময় থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে এক সপ্তাহের মধ্যেই উদ্যোগ নিতে হবে। তার মতে, এখন আর সময় নষ্টের অবকাশ নেই—কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখন হুমকির মুখে।

এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। পরে মাত্র ২ শতাংশ কমিয়ে তা ৩৫ শতাংশে নামানো হয়েছে, যা আগামী ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ‘উইন-উইন’ অবস্থান অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এই শুল্কের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত—পোশাক শিল্পে। অথচ একই সময় ভিয়েতনামের ওপর চাপানো শুল্ক ৪৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামানো হয়েছে।

ভিয়েতনাম ইতিমধ্যে বড় ছাড় আদায় করে নিয়েছে। এখন যদি ভারত ও পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সফলভাবে নিজেদের পক্ষে সুবিধা আদায় করতে পারে এবং বাংলাদেশ যদি তেমন কিছু না করতে পারে, তাহলে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের চিঠির জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া ট্রুথ সোশ্যালে জানান, বাংলাদেশের শুল্ক ও অশুল্ক নীতিমালা এবং বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, যা অন্যান্য খাতভিত্তিক শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে প্রযোজ্য হবে। ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পণ্য পাঠালেও এড়ানো যাবে না এই শুল্ক। তিনি আরও হুঁশিয়ার করেন, যদি বাংলাদেশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও বাড়তি শুল্ক বসাবে।

ব্যবসায়ী মহলের বড় অংশ মনে করছে, এত অল্প সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক কমানো সম্ভব নয়। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) পরিচালক আশরাফ আহমেদ বলেন, এলপিজি, সয়াবিন ও তুলা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাবগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব একটা আকর্ষণীয় ছিল না। ইতিমধ্যে মার্কিন কোম্পানিগুলো আগাম পোশাক মজুত করে ফেলেছে, ফলে নতুন অর্ডার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে আশাবাদী মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বাণিজ্য উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং বাণিজ্য সচিব একটি প্রতিনিধি দলে যোগ দিতে আজই ঢাকা ছাড়ছেন। তিনি জানান, রবিবার ইতিমধ্যে এক দফা আলোচনা হয়েছে, এবং আগামীকাল আবারও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ৭.৬০ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানির ১৭.০৯ শতাংশ। এর মধ্যে ওভেন পোশাক ২৫.৯৩ শতাংশ, নিট পোশাক ১১.৭১ শতাংশ এবং হোম টেক্সটাইল ১৬.১২ শতাংশ ছিল। এসব খাতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নতুন শুল্কনীতিতে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী প্রেসিডেন্ট ফজলে শামীম এহসান বলেন, বুধবারের মিটিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি সফল হলে শুল্ক কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি জানান, যদিও ভারতের ওপর ২৭ শতাংশ শুল্ক রয়েছে, তবে ট্রাম্প ব্রিকস দেশগুলোর ওপর আলাদা করে আরও ১০ শতাংশ শুল্ক বসাতে পারেন। যদি চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কোনও সমঝোতায় পৌঁছে, তবে বাংলাদেশের বিপদ বাড়বে। তবে যদি চীন ও ভারতের ওপর বর্তমান উচ্চ শুল্ক বহাল থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য কিছুটা হলেও সুবিধা থাকবে।

All Categories