যুক্তরাজ্যে হাসিনা ঘনিষ্ঠদের সম্পদ লেনদেন: দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন
ক্ষমতা হারানো শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের যুক্তরাজ্যে মালিকানাধীন সম্পদ দ্রুতগতিতে বিক্রি, বন্ধক কিংবা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে উঠে এসেছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এবং দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর যৌথ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের তদন্তাধীন ব্যক্তিদের অন্তত ২০টি সম্পত্তি লেনদেনের আবেদন গত এক বছরে জমা পড়েছে যুক্তরাজ্যের জমি নিবন্ধন দপ্তরে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব লেনদেন মূলত সম্পদ বিক্রি, হস্তান্তর কিংবা বন্ধকের ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশে যখন দুর্নীতির তদন্ত চলছে, ঠিক তখনই এই সম্পদ স্থানান্তরের চেষ্টা নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন।
২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি প্রধানমন্ত্রী হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ছেলে ও ভাতিজার নামে থাকা প্রায় ১,৪৬৯ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করে। এর ঠিক তিন সপ্তাহের মাথায় ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ২,৭৭৬ কোটি টাকার সম্পদও জব্দ করা হয়, যার মধ্যে শুধু যুক্তরাজ্যেই রয়েছে ৩০০টির বেশি প্রপার্টি।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আমরা সম্পদ বিক্রির চেষ্টার বিষয়ে অবগত। তাই আশা করছি, আরও সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হবে যাতে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব লেনদেন বন্ধ থাকে।"
গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, এসব সম্পদ লেনদেনে সহায়তা করছে যুক্তরাজ্যের কিছু আইনি প্রতিষ্ঠান ও পরামর্শক, যাদের সতর্কতা ও দায়িত্ববোধ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এই অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বসুন্ধরা গ্রুপের কর্ণধার আহমেদ আকবর সোবহান ও তার পরিবারের নামও। তাঁদের মালিকানাধীন প্রায় ৪০০ কোটি টাকার সম্পত্তির অন্তত তিনটি লেনদেনের চিহ্ন মিলেছে, যার একটি লন্ডনের নাইটসব্রিজ এলাকায় একটি চারতলা টাউনহাউস। এটির মালিকানা আগে সরাসরি সোবহানপুত্র সায়েম সোবহান আনভীরের নামে ছিল।
তাছাড়া সারে’র ভার্জিনিয়া ওয়াটারে সোবহান পরিবারের আরেক সদস্যের নামে থাকা ১৩০ কোটি টাকার ম্যানসনের লেনদেন নিয়েও তদন্ত চলছে।
সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান সম্প্রতি লন্ডনের রিজেন্টস পার্ক এলাকায় ১৬৩ কোটি টাকার জর্জিয়ান টাউনহাউস বিক্রি করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আরও তিনটি লেনদেনের আবেদন জমা পড়েছে। যদিও তাঁর আইনজীবীরা দাবি করছেন, এসব সম্পদ জব্দ করার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
সালমান এফ রহমানের ছেলে আহমেদ শায়ান এবং ভাতিজা আহমেদ শাহরিয়ার রহমানের নামে থাকা লন্ডনের সম্পত্তি নিয়েও অনুসন্ধান চলছে। গার্ডিয়ান জানায়, মেফেয়ারের গ্রোসভেনর স্কয়ারের একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, যার মূল্য প্রায় ৫৭১ কোটি টাকা, সম্প্রতি জব্দ করা হয়েছে।
ব্রিটিশ এমপি এবং সর্বদলীয় সংসদীয় গ্রুপের সভাপতি জো পাওয়েল বলেন, "যদি তদন্ত চলাকালীন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে এসব সম্পদ খুব সহজেই হস্তান্তর হয়ে যেতে পারে।" তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাজ্যের উচিত সন্দেহভাজন এসব লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা।
অন্যদিকে, এসব মামলার অনেক অভিযুক্তই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা হিসেবে দাবি করে নিজেদের নির্দোষ বলছেন এবং যুক্তরাজ্যে যেকোনো তদন্তে সহায়তা করার আশ্বাস দিয়েছেন।