যুদ্ধবিরতির আলো জ্বলছে না লেবানন-গাজায়, নতুন করে হত্যাযজ্ঞ

দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং এক ডজনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই খবর জানিয়েছে।লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে ইসরায়েল সম্মত হওয়া সত্ত্বেও হামলা চলছে। 

এ ছাড়া লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ)-এর তথ্যমতে, জুয়াইয়া গ্রামে ইসরায়েলের আরেকটি পৃথক হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের সোহমোর, রুমিন, আল-কুসাইবাহ, কাফার হুনাহ এবং নাকুরা গ্রামের বাসিন্দাদের জোরপূর্বক সরে যেতে বলেছে। দক্ষিণের শহর টায়ার থেকে আল জাজিরার ওবাইদা হিত্তো জানান, ‘দক্ষিণ লেবাননে আজ আরো একটি সহিংস দিন গেল।

’ তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঠিক তার বিপরীত ঘটনা ঘটতে দেখছি, ইসরায়েল হামলা আরো তীব্র করেছে।’রবিবার মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ানিম নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘ইসরায়েল ভূখণ্ড রক্ষা করছে, এলাকা শত্রুমুক্ত করছে, ইসরায়েলি জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে এমন এক শত্রুর বিরুদ্ধেও লড়ছে যে, আমাদেরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছে।’

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রবিবার জানিয়েছে, ২ মার্চ যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার পর থেকে দেশজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত দুই হাজার ৯৮৮ জন নিহত এবং নয় হাজার ২১০ জন আহত হয়েছেন।রবিবারের হামলাগুলো ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর ঘটেছে।

ওই আলোচনায় দুই দেশ ৪৫ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়াতে সম্মত হয়েছিল। যদিও ১৭ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া মূল চুক্তিটি কখনোই মানা হয়নি। গত মাসে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েক দশকের ভেতর প্রথম সরাসরি বৈঠকের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৃতীয় দফার আলোচনা শেষ হয়।এনএনএ জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর উদ্দেশ্য হলো ২৯ মে থেকে মার্কিন মধ্যস্থতায় একটি নিরাপত্তা পর্ব শুরু করার সুযোগ দেওয়া এবং দুই পক্ষের মধ্যে পরবর্তী দফার আলোচনা ২ ও ৩ জুন ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

হিজবুল্লাহ সরাসরি আলোচনার বিরোধিতা করেছে।কারণ যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এর কিছু অংশ দখল করে রেখেছে।হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা হুসেন হাজ্জ হাসান রবিবার বলেন, লেবাননের কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলের সঙ্গে যে সরাসরি আলোচনা চালিয়েছে, তা দেশকে একটি অচল অবস্থার দিকে নিয়ে গেছে।

তার মতে, এর ফলে একের পর এক ছাড় দেওয়া ছাড়া আর কোনো ফল আসবে না। তিনি বলেন, ইসরায়েল যা চায়, তা লেবানন সরকার বা অন্য কেউ বাস্তবায়ন করতে পারবে না। বিশেষ করে প্রতিরোধ বাহিনীকে নিরস্ত্র করার বিষয়টি। তার অভিযোগ, সরকার দেশের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করছে।

শনিবার হিজবুল্লাহ জানায়, তারা উত্তর ইসরায়েলে একটি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর আগে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধেও কয়েকটি অভিযানের দাবি করে সংগঠনটি। এই সংঘাতের কারণে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।ড্যানিশ শরণার্থী পরিষদ-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ও এপ্রিলের মধ্যে লড়াইয়ের কারণে ১২ লাখের বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে।সংঘাতের কারণে লেবাননের অর্থনীতিও মারাত্মক চাপে পড়েছে।

লেবানিজ বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন-এর প্রধান বাসেম এল-বাবাব বলেন, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

তিনি জানান, দেশ পুনর্গঠনে অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার লাগবে। সংঘাত দীর্ঘ হলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। তার মতে, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি লেবানন প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার পরোক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

গাজা

এদিকে গাজা উপত্যকাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত আটজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দেইর আল-বালাহতে তিনজন এবং খান ইউনিস ও বেইত লাহিয়াতে বাকিরা নিহত হয়েছেন।

গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার হিন্দ খৌদারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার গাজার মধ্যাঞ্চলীয় শহর দেইর আল-বালাহতে একটি গণ-রান্নাঘরে হামলা চালানো হয়। এতে তিনজন নিহত হন। তারা ওই গণ-রান্নাঘরের কর্মী ছিলেন।

খৌদারি আরো বলেন, ‘এটি প্রমাণ করে, ইসরায়েল শুধু মানুষকেই নয়, বরং গাজাজুড়ে জনগণের সেবায় নিয়োজিত সংগঠনগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।’ একই হামলার প্রতিক্রিয়ায় হামাস বলেছে, ‘এটি একটি পরিকল্পিত যুদ্ধাপরাধ এবং গাজা উপত্যকায় আমাদের জনগণের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যার একটি নতুন দৃশ্য।’

সশস্ত্র গোষ্ঠীটি তাদের বিবৃতিতে বলেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘অযৌক্তিক নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা’ ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মূল্যবোধ উপেক্ষা করে হামলা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করছে।

রবিবার গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে অন্তত ৭২ হাজার ৭৬০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গত অক্টোবরে ঘোষিত তথাকথিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে নিহত হয়েছেন অন্তত ৮৭১ জন।

এদিকে, ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এই এলাকাগুলো একটি তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’ বাফার জোন দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।

রবিবার সেই অঞ্চলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের বাহিনী একজনকে হত্যা করেছে। কোনো প্রমাণ না দিয়েই তারা বলেছে, নিহত ব্যক্তি সশস্ত্র ছিলেন এবং সৈন্যদের জন্য আসন্ন হুমকি সৃষ্টি করছিলেন।

সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, হামাসের একজন কমান্ডার নিহত হয়েছেন এবং নিহত ব্যক্তির নাম বাহা বারুদ। দলটির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
 

 


 

All Categories