অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছেই
মসজিদে জুমার নামাজ শেষে বাসায় ফেরার উদ্দেশে রামপুরা টিভি সেন্টারের উল্টোপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীর্ঘদিন জেল খেটে জামিনে থাকা ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’। এরই মধ্যে মোটরসাইকেলযোগে এসে দুই কিশোর-যুবক তাঁকে ফ্লিল্মি স্টাইলে গুলি করে পালিয়ে যায়।
এর দুই ঘণ্টা আগে গতকাল দুপুরের দিকে খুলনায় রফিকুল ইসলাম নামে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এর এক সপ্তাহ আগে বিকেল সোয়া ৩টার দিকে মতিঝিল শাপলা চত্বরসংলগ্ন জনতা ব্যাংকের সামনে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে গুলি করে মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসায়ী লোকমান হোসেনকে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি জেলায় অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বেড়েছে। অপরাধ জগতে (আন্ডারওয়ার্ল্ডে) অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি।নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, এসব অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চলছে। এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসীদের ধরতে থানা-পুলিশকে আরো বেশি তৎপর হতে হবে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য : পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, গত মে মাস থেকে শুরু হওয়া চলমান বিশেষ অভিযানে এ পর্যন্ত ১৮ হাজার ৩২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে অবৈধ অস্ত্রধারী গ্রেপ্তার হয়েছে ৩৩১ জন।দেশে অস্থিতিশীলতার পরিকল্পনাকারী ও তাদের সহযোগী গ্রেপ্তার হয়েছে এক হাজার ৯৯৮ জন। ছিনতাইকারী দস্যু-ডাকাত গ্রেপ্তার হয়েছে দুই হাজার ২১১ জন। চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে ৮০৮ জন।
গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে : চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আন্তত ২১ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ১৩৮ জনের বেশি গুলিতে আহত হয়।এর মধ্যে সর্বশেষ গত মে মাসে অন্তত ১১ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের অনুসন্ধ্যানে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র বলছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তঃকোন্দল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ হামলার ঘটনা ঘটে।এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানীর গুলির ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে একাধিক টিম কাজ করছে।
২০০১ সালে সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকার ২ নম্বরে টিটনের নাম ছিল জানিয়ে সূত্র বলছে, টিটনের ভগ্নিপতি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন। এদের সঙ্গে এক হাজারের বেশি অস্ত্রধারী ক্যাডার বাহিনী রয়েছে, যাদের প্রত্যেকের কাছে অবৈধ ক্ষুদ্র অস্ত্র
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্র বলছে, দেশে অপরাধ বাড়ার মূলে রয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পর্দার আড়ালে থেকে সহযোগীদের পরিচালনা করছে। তাদের হাতে কয়েক হাজার অবৈধ অস্ত্র রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা : এর আগে পুরান ঢাকার আদালতপাড়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুনকে গুলি করে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্ত্রাসীরা অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র অস্ত্র ব্যবহার করে। এ ছাড়া রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এরপর পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে মসলা ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানকেও নতুন ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর কয়েক দিন আগে খুলনায় আদালতপাড়ায় প্রকাশ্যে দুজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় নতুন ধরনের অত্যাধুনিক ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এর আগে মিরপুর এলাকায় যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় এ ধরনের অস্ত্র দিয়ে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ব্যস্ততম সড়কে প্রকাশ্যে আব্দুল হাকিম নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয় এ ধরনের অস্ত্র দিয়ে। এভাবে একাধিক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন।
জামিনে থেকে অপরাধে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা : পুলিশ ও আদালত সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর অন্তত ছয়জন শীর্ষ সন্ত্রাসী দীর্ঘ দিন কারাগারে থেকে জামিনে মুক্তি পান। এর মধ্যে ছিলেন ঢাকার অপরাধজগতের অন্যতম সদস্য খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন। এ ছাড়া জামিনে বেরিয়ে এসে যারা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন ও খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু। এ ছাড়া মিরপুরের অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রক ‘কিলার আব্বাস’ হিসেবে পরিচিত আব্বাস আলী ও পূর্ব রাজাবাজার এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী জামিন পাওয়া এই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই দেশের বাইরে পালিয়ে যায়। তাদের কেউ কেউ এরই মধ্যে দেশে ফিরেছে। অনেকেই চেষ্টা চালাচ্ছে দেশে ফেরার। এদের বাইরে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে গ্রেপ্তার না হওয়া জিসান আহমেদ ওরফে জিসান দীর্ঘদিন ধরে মতিঝিল ও রামপুরাসহ আরো কয়েকটি এলাকায় ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি শুরু করেছে।
জামিনে থেকে তারা আর আদালতে ঠিকমতো হাজিরা দেয় না জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তালিকাভুক্ত এসব সন্ত্রাসী এখন দেশ ও দেশের বাইরে থেকে অপরাধ জগৎ ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর বাইরে বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানও দেশে সহযোগীদের দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার বলেন, রাসেলকে গুলির ঘটনায় ৩ এপ্রিল মামলা হলে তদন্তে দেখা যায়, কলমের মতো দেখতে কিছু একটা জিনিস তার বুকে ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। এই ঘটনায় কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার আসামি সোহেলের কাছ থেকে একটি ‘পেনগান’ উদ্ধার করা হয়।
রামপুরায় গুলি: রাজধানীর হাতিরঝিল থানার রামপুরা টিভি সেন্টার এলাকায় ইয়াসিন খান পলাশ এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। এলাকায় তিনি পলাশ ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’ নামে পরিচিত। তার ঘনিষ্ঠরা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে তথ্য রয়েছে।
হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান বলেন, পলাশকে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে গুলি করা হতে পারে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শীদের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ (ভিডিও ফুটেজ) সংগ্রহ করে যাচাই চলছে। জানতে চাইলে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানান, গুলিবিদ্ধ পলাশ দীর্ঘ ১৮ বছর জেল খেটে মাসখানেক আগে জামিনে বের হন। তাঁর বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা না থাকায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাসহ অন্তত ১০টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কারা তাঁকে গুলি করেছে তার তদন্ত চলছে। বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।
গতকাল খুলনায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত খুলনায় ১৭টি হত্যার ঘটনা ঘটে, যার বেশির ভাগ গুলিতে নিহত হয়।
সীমান্তে আগ্নেয়াস্ত্রে ৬২ হত্যা : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অস্ত্রে খুনাখুনি বেশি ঘটছে। গত দেড় বছরে যশোর সীমান্ত এলাকায় ৬২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশেই বিদেশি পিস্তল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শার্শা ও বেনাপোল সীমান্ত থেকে বিদেশি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
উদ্ধার করা অস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য : এর আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মধ্য বাড্ডা এলাকা থেকে মেহেদী হাসান ওরফে দীপু নামে এক যুবককে গেপ্তার করা হয়। আইন-শৃৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা জানতে পারে, সে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ক্যাডার। অভিযানের সময় যৌথ বাহিনী তার ফ্ল্যাট এবং পাশের একটি রিকশা গ্যারেজে রাখা নষ্ট ভ্যান থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে, যার বেশির ভাগ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ঢাকায় আনা হয়।
উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক ও জার্মানিতে তৈরি রিভলবার ও পিস্তলসহ ১১টি বিদেশি উন্নতমানের আগ্নেয়াস্ত্র, একটি নতুন অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় .২২ ক্যালিবার একে রাইফেল এবং দুটি এয়ারগান।
যেসব সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে সবচেয়ে বেশি অবৈধ ক্ষুদ্র অস্ত্র প্রবেশ করছে। পার্শ্ববর্তী দেশে তৈরি ‘কাটা রাইফেল’, ‘বেলঘরিয়া পিস্তল’ এবং ৯ এমএম পিস্তলের মতো ছোট আকারের আগ্নেয়াস্ত্র সহজে বহন ও গোপন করা যায়, যা চোরাচালানকে আরো সহজ করে তুলছে।
সাম্প্রতিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পাওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। এসব অস্ত্রে খুনাখুনির কারণে সমাজে আতঙ্ক ছড়াছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আগেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো তৎপর হতে হবে