জাতীয় ঐকমত্যের সংলাপে স্থবিরতা, অগ্রগতির দেখা নেই

সংবিধান সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের চলমান সংলাপে সপ্তম দিনেও বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। রোববার (২৯ জুন) অনুষ্ঠিত সংলাপে অংশ নেওয়া বেশির ভাগ দল তাদের আগের অবস্থানেই অনড় থাকে। বিশেষ করে সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা খর্ব করার প্রস্তাব এবং সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন পদ্ধতি ঘিরে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা গেছে।

সংলাপে বিএনপি জানায়, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে নতুন কমিটির দরকার নেই; বরং বর্তমান আইনি কাঠামো সংস্কার করলেই তা সম্ভব। একই মত দেয় ১২ দলীয় জোট, এনডিএম, লেবার পার্টি, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটসহ মোট পাঁচটি দল ও জোট।

অন্যদিকে, সংলাপে অংশ নেওয়া ৩০ দলের মধ্যে ২৩টি দল আগের মতোই দাবি করে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা কমাতে একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করতে হবে।

সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনেও মতবিরোধ রয়েছে। বিএনপি, এলডিপি ও আরও চারটি দল উচ্চকক্ষে আসন বণ্টনে সংসদের আসন অনুপাতে বরাদ্দের পক্ষে মত দেয়। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ২২টি দল ভোটের অনুপাতে (সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি) আসন বণ্টনের দাবি জানায়। তাদের ভাষ্য, এই পদ্ধতি না হলে উচ্চকক্ষেরই প্রয়োজন নেই। সিপিবি ও বাসদ সরাসরি জানায়, তারা উচ্চকক্ষ চায় না। গণফোরাম এই বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকে।

রবিবার সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে শুরু হওয়া সংলাপ বিকেল সোয়া ৫টা পর্যন্ত চলে। মাঝে ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট বিরতি দেওয়া হয়। পরে দু’দিনের বিরতির ঘোষণা দেয় কমিশন।

সংলাপের শুরুতে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আশাব্যঞ্জক অগ্রগতির ক্ষেত্রে খানিকটা পিছিয়ে আছি। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে যেন কোনো সংশোধন না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা সীমিত করা প্রয়োজন।’

তিনি আরও জানান, সাংবিধানিক নিয়োগে প্রতিটি পদের বিপরীতে দুজনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তার বিরোধিতা এসেছে।

নিয়োগ কমিটি নিয়ে মতবিরোধ

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ইসি, দুদক, মানবাধিকার কমিশন গঠনে ইতিমধ্যেই আইন রয়েছে। সেসব আইন সংস্কার করে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব। কমিটি করলে রাষ্ট্রের ভারসাম্য বিঘ্নিত হবে।

জবাবে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, “সংবিধানিক পদে নিয়োগে আগেও সার্চ কমিটি ছিল, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর গোপন তালিকা থেকেই নিয়োগ হতো। এই প্রবণতা বন্ধ করতে হলে কমিটি আবশ্যক।

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, এক-দুটি দলের দাদাগিরিতে মৌলিক সংস্কার আটকে থাকতে পারে না। এলডিপির চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী জানান, উচ্চকক্ষ গঠনে বিএনপির অবস্থান সমর্থন করলেও নিয়োগ কমিটির প্রস্তাবকে স্বাগত জানায় তার দল।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, সরকার যদি নিজেই ইসি, দুদকসহ সব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়, তাহলে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। বিএনপির অনড় অবস্থানেই সংস্কার প্রক্রিয়া আটকে আছে।

সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ও উচ্চকক্ষ

শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমাবেশে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের দাবি উঠে আসে। সংলাপে দলটির নেতা আশরাফ আলী আকন বলেন, উচ্চকক্ষ আনতে হলে নির্বাচনে আনুপাতিক পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে আমরা উচ্চকক্ষের পক্ষে না।

গণসংহতির প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, সংবিধান সংশোধনে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাখা হলে বিএনপি কি সমর্থন করবে? এ প্রশ্নের উত্তরে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ধরনের প্রস্তাব এলে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে।

তবে জামায়াতসহ অধিকাংশ দল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিরোধিতা করে। এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, “আনুপাতিক না হলে উচ্চকক্ষ অর্থহীন।

ঐকমত্য না হলে কী হবে?

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দিনের পর দিন আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু কবে ঐকমত্য হবে, কেউ জানে না।

আখতার হোসেন বলেন, “শুধু নির্বাচন আয়োজন নয়, বরং মৌলিক সংস্কার সাপেক্ষেই নির্বাচন হতে হবে।” জামায়াত, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ বেশ কয়েকটি দল বিএনপিকে নমনীয় হওয়ার আহ্বান জানায়।

ঐকমত্য না হলে কী হবে—এমন প্রশ্নে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। এখন দেখার বিষয়, কমিশন ঐকমত্যের জন্য নতুন কোনো কৌশল গ্রহণ করে কি না।

All Categories