জাতীয় নির্বাচন ফেব্রুয়ারির শুরুতেই, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্নের নির্দেশ
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বা রমজানের আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের লক্ষ্যে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
গতকাল বুধবার রাতে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, “প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, নির্বাচনকে সামনে রেখে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ৮ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হবে। এদের মধ্যে ৫ লাখ ৭০ হাজার হবেন আনসার সদস্য, এবং ১ লাখ ৪১ হাজার পুলিশের। এ ছাড়া সীমান্তে বিজিবি ও অভ্যন্তরে সেনাবাহিনী থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে। নতুন করে পুলিশ, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডে ১৭ হাজার সদস্য নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশ দিয়েছেন, নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাইকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হবে। প্রয়োজনে রিহার্সাল নির্বাচন করতে হবে। ভোটারদের সচেতন করতে ভিডিও কনটেন্ট বানিয়ে প্রচারের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।”
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, এবার ইন্টারনেট বন্ধ না রেখে ভোট চলাকালীন সংযোগ সচল রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মিডিয়াকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, আগে নির্বাচনে দলীয় লোকজনকে মিডিয়ার নামে নিয়োগ দেওয়া হতো। এবার প্রকৃত সাংবাদিকদের মাধ্যমেই কভারেজ নিশ্চিত করতে হবে।
এবার ৪৭ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি, বডিক্যাম ও বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের সময় ডিসি, এসপি, ওসি ও টিএনওদের র্যান্ডমভাবে রদবদলের নির্দেশ দিয়েছেন। এর জন্য লটারি পদ্ধতির সুপারিশও দিয়েছেন তিনি।
নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতে পৃথক বুথ, নারী সদস্য মোতায়েন ও সচেতনতামূলক উদ্যোগের কথাও বলেন প্রধান উপদেষ্টা। তরুণ ভোটারদের জন্য (১৮-৩৩ বছর) আলাদা তালিকা তৈরি এবং তাঁদের জন্য পৃথক বুথ স্থাপনের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
প্রেস সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বারবার জোর দিয়েছেন একটি সত্যিকারের নির্বাচন আয়োজনের ওপর। তিনি বলেছেন, পূর্বের ভোটের স্মৃতিতে মানুষ মারামারি, ভোটচুরি দেখেছে। এবার যেন ভোটারদের মনে ভালো স্মৃতি গড়ে ওঠে।
সংবাদ সম্মেলনে উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, ভোটের সময় যাতে কোনো দলীয় কর্মীকে পর্যবেক্ষকের নামে না পাঠানো হয়, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠন করা হবে।
নির্বাচনের তফসিল ডিসেম্বরেই ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, নির্বাচনের জন্য ফুল গিয়ারে প্রস্তুতি চলছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভোটের দিন নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
গত জুনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে বৈঠকের পর নির্বাচন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় এখন ফেব্রুয়ারিতেই ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও এই তারিখে ভোট নিয়ে আপত্তি নেই বলে জানানো হয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এই সরকার দীর্ঘমেয়াদি নয়। সাত-আট মাসের মধ্যেই দায়িত্ব হস্তান্তর করা হবে। মৌলিক সংস্কারগুলো দ্রুত সম্পন্ন করে আমরা নির্বাচনমুখী হচ্ছি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি দ্রুত সংলাপ শেষ করে সংস্কার বাস্তবায়নে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন।